মেডিকেল রিপোর্ট পড়ে পরামর্শ দিচ্ছে চ্যাটজিপিটি: দারুণ সুবিধা নাকি নতুন বিপদ?

আজকাল সামান্য শারীরিক অসুবিধা হলেই বা রক্তের রিপোর্ট হাতে পেলেই আমাদের প্রথম কাজ হয় ইন্টারনেটে সার্চ করা। বিশ্বজুড়ে মানুষের এই অভ্যাসের কথা মাথায় রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংস্থা ওপেনএআই (OpenAI) চ্যাটজিপিটিতে চালু করেছে এক নতুন সুবিধা ‘হেলথ ইন চ্যাটজিপিটি’ (Health in ChatGPT)।

এখন থেকে যেকোনো ব্যবহারকারী তাঁদের প্যাথলজি টেস্টের রিপোর্ট, প্রেসক্রিপশন কিংবা ওষুধের তালিকা চ্যাটজিপিটিতে আপলোড করতে পারবেন। এমনকি অ্যাপল হেলথ (Apple Health)-এর মতো ফিটনেস অ্যাপ যুক্ত করে প্রতিদিনের ঘুম, হাঁটাচলা ও শারীরিক অবস্থার তথ্যও এর সাথে কানেক্ট করা যাবে। চ্যাটজিপিটি আপনার পুরোনো রিপোর্টের সাথে নতুন রিপোর্ট মিলিয়ে একটি সহজ বিশ্লেষণ বা সারসংক্ষেপ তৈরি করে বুঝিয়ে দেবে।

তথ্যমতে, প্রতি সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যের নানা বিষয়ে পরামর্শ পেতে চ্যাটজিপিটির শরণাপন্ন হন। তবে এই নজরকাড়া সুবিধার আড়ালে যেসব মারাত্মক ঝুঁকি লুকিয়ে আছে, সে বিষয়ে সতর্ক করছেন বিশ্বের প্রথম সারির এআই ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

এআই কেন ভুল করতে পারে এবং ঝুঁকি কতটা?


কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেক সময় একদম নিখুঁত উত্তর দেওয়ার ভান করে পুরোপুরি ভুল, কাল্পনিক বা বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরি করে প্রযুক্তির ভাষায় যাকে বলা হয় ‘হ্যালুসিনেশন’ (Hallucination)। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই ধরনের একটি ছোট্ট ভুলও কিন্তু মানুষের জীবন সংশয়ের কারণ হতে পারে।

জীবনের ঝুঁকি: যুক্তরাষ্ট্রে চ্যাটজিপিটির ভুল পরামর্শ শুনে এক ব্যক্তির ফুসফুসে রক্ত জমাট বাঁধার (Pulmonary Embolism) মতো মারাত্মক পরিস্থিতির তৈরি হয়েছিল এবং তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি হন। পরবর্তীতে তিনি ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এমনকি ভুল উপাদানের মিশ্রণ সেবন করে এক কিশোরের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে, যেখানে চ্যাটজিপিটি ওই ক্ষতিকর উপাদানটিকে ‘নিরাপদ’ বলে জানিয়েছিল।

ডাক্তারদের সতর্কবার্তা: ওপেনএআই নিজেরাও স্বীকার করেছে যে চ্যাটজিপিটি কোনো ডাক্তার নয় এবং এটি ভুল পরামর্শ দিতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এটি কখনোই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বিকল্প হতে পারে না।

আপনার গোপন শারীরিক তথ্য কতটা নিরাপদ?


মেডিকেল রিপোর্ট মানুষের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ব্যক্তিগত তথ্য। চ্যাটজিপিটিতে রিপোর্ট আপলোড করার আগে তথ্য গোপনীয়তার (Data Privacy) বিষয়টি গুরুত্বের সাথে ভাবা প্রয়োজন।

ওপেনএআই-এর দাবি: কোম্পানিটি জানিয়েছে, তারা এই স্বাস্থ্যগত তথ্যগুলো এনক্রিপশনের মাধ্যমে নিরাপদ রাখবে এবং তা এআই-কে নতুন করে শেখানো (Model Training) বা বিজ্ঞাপন দেখানোর কাজে ব্যবহার করবে না।

বিশেষজ্ঞদের সংশয়: কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্সের অধ্যাপক বিশাল মিশ্র এবং কর্নেল টেকের স্বাস্থ্য-উদ্ভাবন প্রধান তানজিম চৌধুরী মনে করেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই ব্যবহারকারীদের না জানিয়ে তাদের নিয়ম ও স্বত্ব (Terms of Service) পরিবর্তন করে ফেলে। আজকে যা গোপন রাখা হচ্ছে, ভবিষ্যতে তা অন্য কোনো কাজে ব্যবহৃত হবে না এর কোনো শতভাগ গ্যারান্টি নেই।

হেলথ ইন চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের সঠিক নিয়ম


এআই প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণ বর্জন করার প্রয়োজন নেই, তবে এটি ব্যবহারে কিছু জরুরি সতর্কতা মেনে চলা উচিত:

১. রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করুন, সমাধান হিসেবে নয়:
চ্যাটজিপিটি হয়তো আপনার চার পৃষ্ঠার জটিল মেডিকেল রিপোর্টটি সহজে বুঝিয়ে বলতে পারবে। কিন্তু রিপোর্ট দেখে কী ওষুধ খাবেন বা চিকিৎসা নেবেন, সেই সিদ্ধান্ত চ্যাটজিপিটিকে নিতে দেবেন না।

২. মূল সিদ্ধান্ত ডাক্তারের হাতেই রাখুন:
চ্যাটজিপিটি থেকে পাওয়া তথ্য বা বিশ্লেষণগুলো নিয়ে আপনার চিকিৎসকের কাছে যান। তাঁকে জিজ্ঞেস করুন চ্যাটজিপিটির বিশ্লেষণ সঠিক কি না। বাস্তবে রোগী দেখার পর একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

৩. বয়স্ক ও সাধারণ মানুষদের সচেতন করুন:
পরিবারের বয়স্ক বা যারা প্রযুক্তির ঝুঁকি সম্পর্কে তেমন অভিজ্ঞ নন, তাঁরা হয়তো চ্যাটজিপিটির কথাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে আসল চিকিৎসা নেওয়া বন্ধ করে দিতে পারেন। তাঁদের সঠিক বিষয়টি বুঝিয়ে বলা প্রয়োজন।

পরিশেষে: এআই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক সাহায্য করতে পারে, কিন্তু এটি আমাদের শরীরের যত্ন বা জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। চ্যাটজিপিটি থেকে ধারণা নেওয়া যেতেই পারে, তবে স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় একজন প্রকৃত ডাক্তারের পরামর্শের কোনো বিকল্প নেই।

Leave a Comment